পেকুয়া প্রতিনিধি:

দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক ত্যাগ, মামলা-হামলা ও কারাভোগের পরও যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগে কক্সবাজারের পেকুয়ায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে তৃণমূলের একাংশের দূরত্ব এবং সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীরা।

তৃণমূলের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে অনেকে মামলার আসামি হয়েছেন, কারাভোগ করেছেন, দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া ছিলেন এবং আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাঁদের অনেকেই এখনো প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, দলের একাংশের নেতাদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলেও ত্যাগী কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, তৃণমূলের মতামত উপেক্ষা করে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করা হলে তার নেতিবাচক প্রভাব নির্বাচনী ফলাফলে পড়তে পারে। এ নিয়ে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে অসন্তোষের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা চলছে।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে পেকুয়ার বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে বিএনপির কমিটি গঠন করা হয়। একই ধারাবাহিকতায় গঠিত হয় সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি। দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পর ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা ছিল, তাঁদের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তবে তাঁদের একটি অংশের অভিযোগ, সেই প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি। এতে দলের ভেতরে হতাশা ও বঞ্চনাবোধ বাড়ছে।

সম্প্রতি উপজেলা বিএনপির নেতৃত্বে বিভিন্ন ইউনিয়নে অনুষ্ঠিত বর্ধিত সভায় তৃণমূলের একাধিক নেতাকর্মী সাংগঠনিক দূরত্ব ও নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সভাগুলোতে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি ওঠে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন না হলে দলকে নির্বাচনে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে বলেও সতর্ক করেন কেউ কেউ। এসব সভায় ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতৃত্বের কর্মকাণ্ড নিয়েও উপজেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।

বিএনপিকর্মী অ্যাডভোকেট মিনার উদ্দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে দলীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও ঐক্য বজায় রাখতে না পারলে পেকুয়ার সাতটি ইউনিয়নে বিএনপির ভরাডুবি হতে পারে।

বিএনপির তৃণমূল নেতা ইউসুফ রুবেল বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আমরা ভেবেছিলাম, এবার বিএনপির সুদিন ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী হতাশ। উপজেলা ও ইউনিয়ন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করে নতুন করে দলে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের বেশি প্রাধান্য দেওয়া হলে সাংগঠনিক ঐক্য দুর্বল হতে পারে। এ পরিস্থিতির সমাধান না হলে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।

এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব আহাসান উল্লাহ খোকন এবং সাবেক ছাত্রদল নেতা জিয়া ও আজম শরীফসহ আরও কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্যেও আগামী নির্বাচনে এর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোছাইন বলেন, বিগত সময়ে দলের নেতাকর্মীরা অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা বেড়েছে। বড় দলে নেতাকর্মীর সংখ্যাও বেশি। ইউনিয়ন বিএনপির সঙ্গে তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর দূরত্ব রয়েছে। নেতাদের মধ্যেও কিছু ক্ষেত্রে অনৈক্য থাকতে পারে।

তিনি বলেন, এসব বিষয় বৈঠকের মাধ্যমে সমাধান করা হবে। ঐক্যবদ্ধ পেকুয়া বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিয়ে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া হবে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী বাছাই করা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকলেও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক শক্তি, স্থানীয় নেতৃত্বের সমন্বয় এবং তৃণমূলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও নেতৃত্বের দূরত্ব নির্বাচনী সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।

সব মিলিয়ে, তৃণমূলের ক্ষোভ নিরসন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগের মূল্যায়ন এবং নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা এখন পেকুয়া বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে এসব বিরোধের সমাধান কতটা হয়, তার ওপর দলটির সাংগঠনিক ঐক্য ও নির্বাচনী অবস্থান অনেকটাই নির্ভর করছে।